এক জোড়া চোখের সঙ্গে চোখাচোখি হলো একদিন গ্রন্থাগারের দিকে যেতে যেতে। জীবনানন্দ যে অমন চোখেই পাখির নীড় দেখতে পেয়েছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অন্যদিক থেকে আসছিল মেয়েটি। সে তাকিয়ে ছিল অপলক। গভীর দৃষ্টি।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবন তখনো হয়নি। না হওয়াতেই ভালো ছিল। সত্তর দশকের প্রথম ভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলছি।
কলাভবনের গুরুদুয়ারার কোণের দিকটায় ছোট একটা দরজা ছিল। তখনকার ডাকসু অফিসের পাশে টেবিল টেনিস খেলার ঘরটার সামনে দাবার টেবিলগুলো ছাড়িয়ে যেতে হতো। সেই দরজা থেকে গ্রন্থাগার পর্যন্ত ছিল হাঁটার শানবাঁধানো পথ। বাঁ দিকে একটুকরো মাঠ। তার অন্য পারে দুটো গোল দালানের মধ্য দিয়ে দেখা যেত মধুদার ক্যানটিন। সাংবাদিকতায় আমাদের ক্লাস হতো সন্ধ্যায়। তাই দিনের বেলায় হল থেকে বের হতাম এগারোটার দিকে। ওই পথ ধরে চলে যেতাম শরীফ মিয়া বা পেড্রোয় কবিদের আড্ডায়। কিংবা গ্রন্থাগারের বারান্দায় বসে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে। একটি পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার ছিলাম বলে সকালের দিকে টিএসসিতে অনুষ্ঠান থাকলে তার খবর সংগ্রহ করতেও যেতাম।
* * *
সেদিন ওই পর্যন্তই।
পরদিন সকালে হল থেকে বের হওয়ার আগে আবার মেয়েটির মুখ ভেসে উঠল কল্পনায়। পথ চলতে দেখা একটা মুখ আবার দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। তাই চোখ দুটো স্মৃতি থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করলাম। হলো না। কিসের অজানা টানে সূর্য সেন থেকে দ্রুত চলে এলাম কলাভবনে। ডাকসু কক্ষের সামনে দিয়ে এগিয়ে যাই কোনার দরজার দিকে। কী কাণ্ড! বের হতেই দেখি পথটার অন্য প্রান্তে সেই মেয়ে। একা হেঁটে আসছে। নীল-সাদা শাড়িতে চমৎকার লাগছে। মাঝেমধ্যে দু–একটা ছেলেমেয়ে আমাদের মধ্যে চিকের মতো আড়াল বানানোয় দেখাটা আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। খুব ভালো করে দেখলাম। বেশ লম্বা, একহারা গড়ন। কাছাকাছি এলে সে আমার বাঁ দিক দিয়ে চলে যাচ্ছিল। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন থেকে দেখলাম, এক পুরুষ্টু বেণি আঁচলের পাশাপাশি পিঠ বেয়ে নিতম্বের নিচে নামছে। বিনন বাঁধনে জড়িয়ে গেলাম।
তার পরদিন দেখা নেই।
তার পরদিন দেখা নেই।
তার পরদিনও দেখা নেই।
এভাবে কয়েক দিন গেল।
তারে না দেখিতে পাই, থাকি পরের দিনের আশে।
প্রতিদিন একই সময়ে বের হওয়া আমার নৈমিত্তিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আবার একদিন দেখা। ওর চোখে প্রশ্ন, ‘এ কদিন কোথায় ছিলে?’
আমার চোখে জবাব, ‘কখন আসবে বলোনি তো।’
চোখে চোখেই আমাদের কথা হতো। কেন, হতে পারে না বুঝি? গল্প–কবিতায় ‘চোখের ভাষা’ কথাটি পড়েছি। সেটা সত্য হলে চোখের ভাষায় কথাও হতে পারে। যদিও অসুবিধা ছিল। ঠিক জানা হতো না, কেউ কারও কথা বুঝতে পারছে কি না!
এভাবেই দিন আসে, দিন যায়। আমাদের না বলা কথা এগিয়ে চলে।
এর মধ্যে খবর নিতে শুরু করেছি। ও একটা প্রভাবশালী ছাত্র সংগঠনে সক্রিয়।
আমার জন্য আশাহীনতার পথে এক ধাপ।
এক দুর্দান্ত বিভাগের ছাত্রী।
গগনে ব্যর্থতার কালো মেঘ জমে বুঝি। সেই দলে, সেই বিভাগে অনেক নামী ছাত্র। তাঁদের তুলনায় আমি তুচ্ছ। এমন কোনো গুণই নেই, যা ওই বিভাগের একটা মেয়ের মনে ছাপ ফেলতে পারে।
তাঁর নামও জেনেছি—জলপদ্ম। ছেলেবন্ধুর ব্যাপারটা জানা হয়নি।
অনেকটা সোনার হরিণ হারানোর মতো নিজেকে দমিয়ে রাখি। পাঠসংগ্রাম চলতে থাকে। একসময় ডাকসু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হলো। হলে হলে বিভিন্ন দলের প্রার্থী তালিকা সংগ্রহ করেছি পত্রিকার কাজে। রোকেয়া হলে ওর দলের নেত্রী জানিয়েছিলেন, পরদিন দুপুরের দিকে গেলে প্রার্থী তালিকা দিয়ে দেবে। নির্ধারিত সময়ে গিয়ে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ‘আপা এখানেই ছিলেন, একটু দাঁড়ান, উনি হয়তো এখনই আসবেন।’ নেত্রী চামেলী হাউসের দিক থেকে এলেন আর একই সময়ে সেই মেয়েটিও গেট দিয়ে হলে ঢুকল। নেত্রী ওকে থামালেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় যাচ্ছ?’
রুমে যাচ্ছি।
তুমি একটু আমার রুম থেকে প্রার্থী তালিকাটা এনে ওকে দেবে?
হ্যাঁ, দিচ্ছি।
নেত্রী বিদায় নিয়ে বের হয়ে গেলেন। ও আমাকে বলল, ‘আমার সঙ্গে আসুন।’
একটু চমকে গেলেও নিজেকে সামলে নিলাম। ওর সঙ্গে মূল ভবনে গেলাম। মনে হচ্ছিল, কতকাল ধরে হাঁটছি পাশাপাশি, কারও মুখে কথা নেই। আমাকে নিয়ে টিভিরুমে বসিয়ে পাখা ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘আপনি বসুন, আমি আসছি।’ আমি বসে বসে ঘামছি আর হঠাৎ দুজন নির্জনে একা হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতিটা ভাবছি। সে ফিরে এল দেরি না করেই। এসে বসল সোফায় আমার পাশে। বলল, ‘আমি বলছি, আপনি লিখুন।’
ভেবেছিলাম, অন্যান্য হলের মতো একটা কাগজ ধরিয়ে দেবে, তাই নোটবই বা কাগজ নিয়ে যাইনি। বললাম, ‘কাগজটা আমাকে দেওয়া যায় না?’
কাল রাতেই ঠিক করা হয়েছে, আর কপি নেই।
আমি তো কাগজ আনিনি...
এক অদৃশ্য ঈষৎ হাসি মোনালিসার মতো ওর ঠোঁটের ওপর খেলে গেল। হাতের দুটো কাগজের একটা এগিয়ে দিল। সাদা। প্রশ্ন, কলম আছে?
না। আমার সলাজ উত্তর।
ব্লাউজে গোঁজা একটা কলম বের করে দিল। মেয়েরা একপলকেই অনেক কিছু দেখে নেয়। ও দেখেছিল, আমার কাছে কাগজ–কলম কিছু্ই ছিল না।
ওর ত্বকের ঘ্রাণমাখানো কলমটি ধরে তালিকার নাম লেখা শুরু হলো। ও বলছে, আমি মাথা নিচু করে লিখছি। ধীরে, যত্ন করে। আমার কাকের ঠ্যাং-বকের ঠ্যাং হাতের লেখা আদর্শলিপির মতো করার প্রাণপণ চেষ্টা করছি। ওপরে পাখার বাতাসটাকে খুব কমজোর মনে হচ্ছিল। দরদর করে ঘামছিলাম। মাঝেমধ্যে মুখ তুলে দেখেছি, ও নির্নিমেষ আমাকেই দেখছে। একসময় লেখা শেষ হলো।
আমি জিজ্ঞেস করছি, ‘আপনি কি ভালো ছাত্র নয়, সাধারণ একটা চাকরি করে—এমন কোনো ছেলের সঙ্গে ঘর বাঁধতে, জীবন কাটাতে রাজি হবেন?’
ছেলেটাকে জানলে ভেবে দেখতে পারি।
ধরুন ছেলেটা যদি...
তাহলে যাই? ওর কথায় সম্বিত ফিরল। কথাগুলো তাহলে মনে মনে ভাবছিলাম!
হ্যাঁ। ধন্যবাদ। আর কথা বাড়াতে পারিনি। পরে অনেকবার ভেবেছি, ও আমাকে হলের ভেতর নিয়ে গিয়েছিল কেন? কোনো বিশেষ কথা কি শুনতে চেয়েছিল?
এরপর ডাকসুর নির্বাচন ভন্ডুল হলো। দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন হলো। বাকশাল সব পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়ায় বেকার হয়ে গেলাম। অভাবে পড়লাম। বেশ কষ্ট করেই পড়াশোনা শেষ করে আবার সাংবাদিকতায় ফিরে গেলাম। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার সময় বা পরে ওর সম্পর্কে আর কিছু্ই জানতাম না। জীবনের শিল-নোড়া হৃদয়বৃত্তির অস্পষ্ট ঘটনাটা মুছে দিয়েছিল।
তারপর বহু বছর কেটে গেছে। কখনো কখনো ছাত্রজীবনের কথা মনে হতে ওর কথাও মনে পড়েছে। আবার ভুলেও গেছি। অবসর নিয়েছি। প্রবাসে আছি। প্রযুক্তির বিবর্তনে স্মৃতিচারোর নতুন উপায় উদ্ভাবন করেছি। যেসব জায়গায় জীবন কেটেছে, গুগল মানচিত্রে সেগুলো দেখার এক অভ্যাস হয়েছে। তাতেই দেখেছি, এখনকার সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের ছবি। মনে হয়েছে, তখন এই দালানটা না থাকাতেই ওকে দেখেছিলাম। কল্পনায় ওর সঙ্গে সংসার করেছি।
* * *
কাহিনিটা এখনেই শেষ হতে পারত। হয়নি যে, বুঝতেই পারছেন। আকস্মিকভাবেই এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পেলাম। (বলা ভালো, বন্ধুটি কিংবা অন্য কেউ এই কাহিনির বিন্দুবিসর্গও জানত না, জানে না।) খবরটা সে আমাকে জানানোর জন্যও বলেনি। জানলাম, জলপদ্ম ইউরোপের কোনো দেশে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় বেশ উঁচু পদে কাজ করত। কী এক কঠিন অসুখে কিছুদিন আগে বিশ্বসংসার থেকে বিদায় নিয়েছে।
খবরটা চৈতন্যে ব্যথা–না ব্যাথার এক টংকার দিয়ে গেছে। শুধু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে, ‘জলপদ্ম, তুমি কি আমার বুকের সাগরে ভাসতে চেয়েছিলে?’
0 Comments